History from Below কী? সহজ বাংলায় নিম্নবর্গের ইতিহাসর ধারণা ও উদাহরণ
ইতিহাস কি শুধু শাসকদের গল্প?
আমরা যখন কোন ইতিহাস পড়ি, তখন সাধারণত কার কথা বেশি শুনি? রাজা, সম্রাট, রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, যুদ্ধের সেনাপতি, রাজনৈতিক নেতা কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের। কিন্তু একটি সাধারণ কৃষক কীভাবে জীবনযাপন করত? একজন শ্রমিকের দৈনন্দিন সংগ্রাম কেমন ছিল? কোনো বিদ্রোহে সাধারণ মানুষের ভূমিকা কী ছিল? নারীরা কীভাবে পরিবার, সমাজ ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিল? আদিবাসী জনগোষ্ঠী কীভাবে নিজেদের অধিকার রক্ষা করত? এসব প্রশ্নের উত্তর প্রচলিত ইতিহাসের পাতায় অনেক সময় তুলনামূলকভাবে কম দেখা যায়। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে “History from Below” বা “নিচ থেকে ইতিহাস” ধারণাটি। সহজ ভাষায় বললে,
History from Below হলো এমন ইতিহাসচর্চা, যেখানে রাজা-শাসক ও অভিজাতদের পরিবর্তে সাধারণ, শ্রমজীবী, কৃষক, নারী, আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের অভিজ্ঞতা, জীবন, সংগ্রাম ও ভূমিকা থেকে ইতিহাসকে বোঝার চেষ্টা করা হয়।
এটি শুধু ইতিহাসের বিষয় পরিবর্তন করে না; বরং কার দৃষ্টিতে ইতিহাস লেখা হচ্ছে? এই মৌলিক প্রশ্নটিও সামনে নিয়ে আসে। কারণ শুধু রাজা কিংবা শাসকের দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ঘটনাকে দেখলেই সেটি যে নির্ভরযোগ্য হবে তার কোন প্রমাণ নেই।
History from Below কী?
History from Below-এর বাংলা করা যায় নিম্নবর্গের ইতিহাস, নিচ থেকে ইতিহাস, নিম্নস্তর থেকে ইতিহাস বা সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে ইতিহাস। এখানে “Below” বা “নিচ” বলতে নিচু বা অযোগ্য মানুষ বোঝানো হচ্ছে না। বরং সমাজের ক্ষমতার কাঠামোর নিচের স্তরে থাকা বা প্রচলিত ইতিহাসে কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া জনগোষ্ঠীকে বোঝানো হয়। এই ইতিহাসচর্চার কেন্দ্রে থাকে: কৃষক, শ্রমিক, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নিম্নবর্গ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, অভিবাসী, উপনিবেশিত জনগণ ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। অর্থাৎ, ইতিহাসকে শুধু “উপর থেকে” নয়, বরং “নিচ থেকে” দেখার চেষ্টা করা হয়।
History from Below-এর মূল ধারণা
প্রচলিত ইতিহাসে একটি যুদ্ধের আলোচনা হলে আমরা হয়তো জানি, কে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল → কোন রাজা নেতৃত্ব দিয়েছিল → কে জয়ী হয়েছিল → কী চুক্তি হয়েছিল। কিন্তু History from Below আরও কিছু প্রশ্ন করে, যেমনঃ সাধারণ মানুষ কীভাবে যুদ্ধের শিকার হয়েছিল?, কৃষকদের ওপর কী প্রভাব পড়েছিল?, শ্রমিকদের জীবন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল?, নারীদের অভিজ্ঞতা কী ছিল?, সাধারণ মানুষ কি নিজেরাও কোনো ভূমিকা পালন করেছিল?। অর্থাৎ ইতিহাসের “বড় ঘটনা”কে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা History from Below’র একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।
History from Below-এর উৎপত্তি
History from Below কোনো একক ব্যক্তির আবিষ্কার নয়। ইউরোপের সামাজিক ও শ্রমিক ইতিহাসচর্চায় এটি বিশেষভাবে বিকশিত হয়। বিশেষ করে ২০ শতকে কিছু ইতিহাসবিদ প্রচলিত political history বা রাজনৈতিক নেতাকেন্দ্রিক ইতিহাসের পরিবর্তে সাধারণ মানুষের জীবন ও সংগ্রাম নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নাম হলো E. P. Thompson। তাঁর বিখ্যাত বই The Making of the English Working Class (1963)-এ তিনি ইংল্যান্ডের শ্রমিক শ্রেণির গঠন, অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও সংগ্রাম বিশ্লেষণ করেন। Thompson দেখিয়েছিলেন যে শ্রমিক শ্রেণি শুধু অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ফল নয়; তাদের অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি, সংগঠন ও সংগ্রামের মধ্য দিয়েও শ্রেণিচেতনা গড়ে ওঠে।
E. P. Thompson এবং History from Below
E. P. Thompson, History from Below-এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একজন গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসবিদ। তাঁর গবেষণায় সাধারণ শ্রমিকরা আর ইতিহাসের “নিষ্ক্রিয় চরিত্র” নয়। বরং তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের মাধ্যমে ইতিহাস নির্মাণে ভূমিকা রাখে। উদাহরণর হিসেবে বলা যায়-
যখন আমরা শিল্প বিপ্লব নিয়ে পড়তে যায়, তার ইতিহাস আমরা সাধারণত এভাবে পড়তে পারি, শিল্পকারখানা তৈরি হলো → উৎপাদন বাড়ল → অর্থনৈতিক পরিবর্তন হলো। কিন্তু ঠিক History from Below প্রশ্ন করবে- কারখানায় শ্রমিকরা কীভাবে কাজ করত?, তাদের মজুরি কেমন ছিল?, কাজের সময় কত দীর্ঘ ছিল?, নারী ও শিশু শ্রমের অবস্থা কী ছিল?, শ্রমিকরা কীভাবে প্রতিবাদ করেছিল?। ফলে একই ইতিহাসের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র সামনে আসে।
Ranajit Guha এবং History from Below
তবে এ বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে Ranajit Guha-এর কাজ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি Subaltern Studies ধারার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা এবং পথিকৃৎ। Guha মনে করেন, ভারতীয় ইতিহাসচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে Colonial Elite এবং Nationalist Elite-এর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইতিহাসে ব্রিটিশ শাসক ও ভারতীয় রাজনৈতিক অভিজাতদের কর্মকাণ্ড বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কৃষক কোথায়?, আদিবাসী কোথায়?, সাধারণ মানুষের বিদ্রোহ কোথায়? কিংবা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা কোথায়? আর এই প্রশ্ন থেকেই Subaltern Studies-এর বিকাশ ঘটে।
History from Below ও Subaltern History কি একই?
দুটির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও এগুলো একেবারে একই বিষয় নয়।সহজভাবে বলা যায়।
History from Below একটি বিস্তৃত ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি; Subaltern Studies তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিশেষ তাত্ত্বিক ও গবেষণাধারা।
একটি সহজ উদাহরণ: কৃষক বিদ্রোহ
উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, কোনো অঞ্চলে কৃষকরা অতিরিক্ত কর বা খাজনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করল। প্রচলিত ইতিহাস হয়তো লিখবে, “অমুক রাজনৈতিক নেতা বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন।” কিন্তু History from Below প্রশ্ন করবে।
কৃষকদের অসন্তোষের কারণ কী?
তাদের দৈনন্দিন জীবন কেমন ছিল?
তারা কীভাবে সংগঠিত হয়েছিল?
তাদের নিজেদের দাবি কী ছিল?
তারা কেন বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিল?
বিদ্রোহের ফলে সাধারণ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছিল?
এখানে ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে কৃষক নিজেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে History from Below
বাংলাদেশের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রেও History from Below অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টিভঙ্গি হতে পারে। আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসে সাধারণত বড় রাজনৈতিক ঘটনা ও জাতীয় নেতাদের ভূমিকা নিয়ে বেশি আলোচনা করি। কিন্তু একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
উদাহরণ ১: মুক্তিযুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সামরিক অভিযান ও আন্তর্জাতিক কূটনীতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু History from Below আরও জানতে চাইবে:
গ্রামের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা কী ছিল?
শরণার্থীদের জীবন কেমন ছিল?
নারীরা কী ভূমিকা পালন করেছিলেন?
কৃষক ও শ্রমিকদের ওপর যুদ্ধের প্রভাব কী ছিল?
সাধারণ মানুষ কীভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিল?
যুদ্ধের সময় সাধারণ পরিবারের জীবন কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছিল?
এভাবে মুক্তিযুদ্ধকে শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক ইতিহাস হিসেবে নয়, সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতার ইতিহাস হিসেবেও দেখা যায়।
উদাহরণ ২: গার্মেন্টস শ্রমিক
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিহাসে তৈরি পোশাক শিল্প অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি উপর থেকে লেখা ইতিহাস বলতে পারে, “বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন বেড়েছে।” কিন্তু History from Below প্রশ্ন করবে। এই শিল্পের পেছনে থাকা শ্রমিকদের জীবন কেমন? আর গবেষণায় দেখা যেতে পারে- শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, মজুরি, কর্মঘণ্টা, নারী শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা, পরিবার ও কাজের সম্পর্ক, শ্রমিক আন্দোলন, কর্মস্থলে নিরাপত্তা। ফলে অর্থনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি শ্রমজীবী মানুষের সামাজিক ইতিহাসও সামনে আসে।
উদাহরণ ৩: চা-শ্রমিক
বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস শুধু উৎপাদন, বাগান মালিক বা অর্থনীতির ইতিহাস নয়। History from Below চা-শ্রমিকদের জীবনকে কেন্দ্রে এনে প্রশ্ন করতে পারে,
তাদের পূর্বপুরুষেরা কীভাবে এই অঞ্চলে এসেছিল?
তাদের সামাজিক জীবন কেমন?
তাদের শ্রমের মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হয়?
তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিস্থিতি কেমন?
এতে একটি শিল্পের ইতিহাসের পাশাপাশি শ্রমিক জনগোষ্ঠীর সামাজিক ইতিহাসও বোঝা যায়।
History from Below কীভাবে ইতিহাস সংগ্রহ করে?
এই পদ্ধতিতে শুধু সরকারি নথির ওপর নির্ভর করা হয় না। গবেষক বিভিন্ন উৎস ব্যবহার করতে পারেন:
লিখিত উৎস
সরকারি নথি
সংবাদপত্র
আদালতের নথি
ব্যক্তিগত চিঠি
ডায়েরি
সংগঠনের নথি
মৌখিক উৎস
Oral History
সাক্ষাৎকার
ব্যক্তিগত স্মৃতি
প্রবীণ মানুষের বক্তব্য
সাংস্কৃতিক উৎস
লোকগান
লোককাহিনি
কবিতা
পোস্টার
দেয়াললিখন
স্থানীয় সংস্কৃতি
এতে এমন মানুষের অভিজ্ঞতাও গবেষণায় আসতে পারে, যারা সাধারণত লিখিত ইতিহাসের নথিতে খুব কম উপস্থিত।
History from Below-এর মূল বৈশিষ্ট্য
১. সাধারণ মানুষকে ইতিহাসের কেন্দ্রে আনা: ইতিহাসের নায়ক শুধু রাজা বা রাজনৈতিক নেতা নয়।
২. Elite-centric history-এর সমালোচনা: ক্ষমতাবানদের দৃষ্টিকোণকে একমাত্র সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না।
৩. Agency-এর ওপর গুরুত্ব: সাধারণ মানুষ শুধু ঘটনার শিকার নয়; তারাও ইতিহাস তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
৪. দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্ব: খাদ্য, কাজ, পরিবার, সংস্কৃতি, শ্রম, শিক্ষা—এসবও ইতিহাসের বিষয়।
৫. প্রান্তিক কণ্ঠস্বরকে গুরুত্ব: যাদের ইতিহাসে কম প্রতিনিধিত্ব রয়েছে, তাদের অভিজ্ঞতা অনুসন্ধান করা হয়।
কেন History from Below গুরুত্বপূর্ণ?
১. ইতিহাসকে আরও বহুমাত্রিক করে
একটি ঘটনা সম্পর্কে শুধু শাসকের বক্তব্য জানলে সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় না।
সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা যুক্ত করলে ইতিহাস আরও সমৃদ্ধ হয়।
২. ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝা যায়
কে সিদ্ধান্ত নেয়?
কার কথা শোনা হয়?
কার কথা উপেক্ষিত হয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়।
৩. সাধারণ মানুষের Agency বোঝা যায়
সাধারণ মানুষ শুধু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের শিকার নয়। তারা আন্দোলন, প্রতিরোধ ও সামাজিক পরিবর্তনের অংশীদারও হতে পারে।
৪. সামাজিক ইতিহাসকে শক্তিশালী করে
রাজনৈতিক ইতিহাসের পাশাপাশি, শ্রম + পরিবার + সংস্কৃতি + শ্রেণি + লিঙ্গ + দৈনন্দিন জীবন। এসব বিষয় ইতিহাসের আলোচনায় আসে।
History from Below-এর সীমাবদ্ধতা
এই পদ্ধতিও সমালোচনার বাইরে নয়।
১. সব প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠ পাওয়া সম্ভব নয়
অনেক সাধারণ মানুষের কোনো লিখিত নথি নেই। ফলে তাদের অভিজ্ঞতা পুনর্গঠন কঠিন।
২. গবেষকের interpretation-এর সমস্যা
গবেষক অন্যের বক্তব্য ব্যাখ্যা করেন। ফলে তাঁর নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাব ফেলতে পারে।
৩. “নিচের মানুষ” একক গোষ্ঠী নয়
কৃষক, শ্রমিক, নারী, আদিবাসী—সবার অভিজ্ঞতা একই নয়।
তাই “সাধারণ মানুষ”কে একটি homogeneous group হিসেবে দেখা সমস্যাজনক।
History from Below-এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এই ধারণার সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো একটি মৌলিক প্রশ্ন, “ইতিহাস কে লিখছে?” এর সঙ্গে আরও দুটি প্রশ্ন যুক্ত করা যায়, কারা ইতিহাসে উপস্থিত? কিংবা কারা ইতিহাস থেকে অনুপস্থিত? এই প্রশ্নগুলো ইতিহাসকে শুধু অতীতের ঘটনা হিসেবে নয়, বরং ক্ষমতা, জ্ঞান ও প্রতিনিধিত্বের বিষয় হিসেবেও বুঝতে সাহায্য করে। এক কথায় History from Below মানে হলো, “ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ইতিহাসকে না দেখে, সমাজের নিচের স্তরে থাকা সাধারণ মানুষের জীবন, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও ভূমিকার দৃষ্টিকোণ থেকে ইতিহাসকে দেখা।”
উপসংহার
ইতিহাস শুধু যুদ্ধ, রাজা, সরকার ও রাজনৈতিক নেতাদের গল্প নয়। একটি সমাজের প্রকৃত পরিবর্তন বুঝতে হলে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষের জীবন ও অভিজ্ঞতাও জানতে হয়। History from Below আমাদের সেই দৃষ্টিভঙ্গিই শেখায়। কৃষকের মাঠ, শ্রমিকের কারখানা, নারীর ঘর ও কর্মক্ষেত্র, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম কিংবা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবন এসবও ইতিহাসের অংশ। তাই ইতিহাস পড়ার সময় শুধু “কে শাসন করেছিল?” প্রশ্নটি নয়, বরং “সাধারণ মানুষ কীভাবে বেঁচেছিল, কীভাবে প্রতিরোধ করেছিল এবং কীভাবে ইতিহাস পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছিল?”এই প্রশ্নটিও করা জরুরি। এটাই History from Below-এর মূল শক্তি।
আরো পড়ুন: জুলাই গণঅভ্যুত্থান: চেতনা, স্মৃতি ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
Frequently Asked Questions (FAQ):
১. History from Below কী?
History from Below বা “নিম্নবর্গের ইতিহাস” হলো এমন একটি ইতিহাসচর্চার পদ্ধতি, যেখানে রাজা, শাসক ও অভিজাতদের পরিবর্তে সাধারণ মানুষ, কৃষক, শ্রমিক, নারী, আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন, অভিজ্ঞতা, সংগ্রাম ও ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২. History from Below-এর মূল উদ্দেশ্য কী?
এর মূল উদ্দেশ্য হলো ইতিহাসকে শুধু ক্ষমতাবানদের দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষের দৃষ্টিকোণ থেকেও বোঝা এবং ইতিহাসে উপেক্ষিত মানুষের ভূমিকা সামনে নিয়ে আসা।
৩. History from Below ধারণার সঙ্গে কোন ইতিহাসবিদদের নাম যুক্ত?
E. P. Thompson সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শ্রমিক শ্রেণির ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষেত্রে Ranajit Guha ও Subaltern Studies এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বিশেষভাবে বিকশিত করেছে।
৪. History from Below এবং Subaltern Studies কি একই?
না, পুরোপুরি একই নয়। History from Below একটি বিস্তৃত ইতিহাসচর্চার দৃষ্টিভঙ্গি। অন্যদিকে Subaltern Studies বিশেষভাবে ক্ষমতাবঞ্চিত ও অধস্তন জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, রাজনৈতিক চেতনা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করে।
৫. Ranajit Guha-এর সঙ্গে History from Below-এর সম্পর্ক কী?
Ranajit Guha ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাসে কৃষক ও অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের ভূমিকা সামনে আনেন। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে সাধারণ মানুষ কেবল অভিজাত রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনুসারী ছিল না; তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক চেতনা ও কর্মকাণ্ডও ছিল।
৬. History from Below-তে কারা ইতিহাসের বিষয়?
এর মধ্যে থাকতে পারে: কৃষক, শ্রমিক, নারী, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, নিম্নবর্গ, দরিদ্র জনগোষ্ঠী, অভিবাসী, উপনিবেশিত জনগণ ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।
৭. বাংলাদেশের ক্ষেত্রে History from Below-এর উদাহরণ কী?
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা, গার্মেন্টস শ্রমিকদের জীবন, চা-শ্রমিকদের ইতিহাস, কৃষকের আন্দোলন, গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সংগ্রাম। এসব বিষয় History from Below-এর দৃষ্টিকোণ থেকে গবেষণা করা যেতে পারে।
৮. মুক্তিযুদ্ধকে কি History from Below-এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করা যায়?
হ্যাঁ। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সামরিক ঘটনাবলির পাশাপাশি সাধারণ মানুষ, শরণার্থী, নারী, কৃষক, শ্রমিক এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে মুক্তিযুদ্ধের একটি “নিচ থেকে” ইতিহাস নির্মাণ করা সম্ভব।
৯. History from Below কেন গুরুত্বপূর্ণ?
কারণ এটি ইতিহাসকে আরও বহুমাত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে। একই সঙ্গে এটি প্রশ্ন করতে সাহায্য করে—কার ইতিহাস লেখা হয়েছে এবং কার ইতিহাস উপেক্ষিত হয়েছে?
১০. History from Below-এর প্রধান সীমাবদ্ধতা কী?
প্রান্তিক মানুষের অনেক অভিজ্ঞতার লিখিত নথি নেই। ফলে গবেষককে মৌখিক ইতিহাস, সাক্ষাৎকার, লোকগান, স্মৃতি ও অন্যান্য উৎসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এসব উৎসের ব্যাখ্যায় গবেষকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিও প্রভাব ফেলতে পারে।
১১. “History from Below” কেন “Below” বলা হয়?
এখানে “Below” বলতে নিচু বা অযোগ্য মানুষ বোঝায় না। এটি মূলত সমাজের ক্ষমতার কাঠামোর তুলনামূলক নিচের স্তরে থাকা এবং প্রচলিত ইতিহাসে কম প্রতিনিধিত্ব পাওয়া জনগোষ্ঠীকে বোঝায়।
